মেধার মূল্যায়ন না হওয়ায় শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে-বিকশিত হবার সুযোগ পাচ্ছে না মেধাবীরা

Untitled-1-copy-300x160মিজানুর রহমান চৌধুরী
যে দেশের গুণীর কদর নেই-সেই দেশে গুণীর জন্ম হয় না, এ প্রবাদ বাক্যটি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে কাকতালিয়ভাবে মিলে যায়। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি-গ্রামের মেধাবীরা সমাজে আলাদাভাবে মূল্যায়িত হতো। তাদের প্রতি সমাজের মানুষের আলাদা শ্রদ্ধাবোধ দেখে ছোট ছোট স্কুল-কলেজগামী ছেলে-মেয়েরা মেধাবী হবার এবং ভালভাবে গড়ে উঠার চেষ্টা করতো। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী মেধাবী হিসেবে চিহ্নিত হতো তাদেরকে সরকারী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে থানা ও ইউনিয়নভিত্তিক মেধাকোটায় বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। ট্যালেন্টপুলে যারা বৃত্তি পেতো তারাই ছিল প্রকৃত মেধাবী। সাধারণ গ্রেডে বৃত্তিপ্রাপ্তরাও মর্যাদার সাথেই বিবেচিত হতো। সে সময় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত একজন কৃতি ছাত্র/ছাত্রী মাসে পঁচাত্তর টাকা প্রতিমাসে বৃত্তি পেতো। সাধারণ গ্রেডধারীরা পেতো মাসে পাঁচশ টাকা। সে সময়ে তাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বিনা বেতনে অত্যন্ত সম্মানের সাথে পড়াশুনার খরচ দেয়া হতো। বই-খাতাসহ শিক্ষা সামগ্রীও দেয়া হতো। যে সময়ের কথা বলছি, তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বেতন পেতেন তিনশত টাকার মত। সে সময়ের পঁচাত্তর টাকা মাসে বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীকে অভিভাবকের কাছ থেকে কোন টাকা নিতে হতো না। মেধাবী বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রী সমাজে তার মান-মর্যাদা বোঝার কারণে নিজ থেকেই পড়াশুনা করার উৎসাহ পেতো। বর্তমানে সরকার শিক্ষার প্রসারে অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কিন্তু মেধাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে প্রতি পদে পদে । বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আগের তুলনায় তা খুবই নগণ্য। অষ্টম শ্রেণীতে সরকারী জুনিয়র বৃত্তি চালু ছিল।  জুনিয়র বৃত্তির সাধারণ গ্রেড ছিল একশত পঁচিশ টাকা এবং ট্যালেন্টপুল ছিল দুইশত পঞ্চাশ টাকা। জুনিয়র বৃত্তি পাওয়া একজন ছাত্র-ছাত্রীকে এসএসসি লেভেল পর্যন্ত মাসে মাসে বৃত্তি দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষা সামগ্রী দেয়া হতো। ধরে নেয়া হতো সে এসএসসিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবে। বাস্তবে হতোও তাই। এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ড স্ট্যান্ড করা ছাত্র-ছাত্রীদের যে মর্যাদা দেয়া হতো তা বর্তমানে নেই। সরকার পাইকারি হারে বৃত্তির ব্যবস্থা করেছে। এ বৃত্তির কোন মেধা স্বীকৃতি নেই। এটাকে বৃত্তি না বলে অনুদান বলাই ভাল। বর্তমানে কেজি স্কুল /মাদ্রাসাসহ সকল পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রী সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছে সেখান থেকে বাছাই করে বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী-অভিভাবক বা পাড়া-মহল্লায় কেউই উৎসাহবোধ করছে না। ফলে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ভাল ফলাফল করেও সমাজে মর্যাদার আসনে আসতে পারে না। গ্রেডিং সিস্টেম হওয়ার কারণে প্রকৃতপক্ষে কে কত নম্বর পেল তা জানা যাচ্ছে না। বর্তমান গ্রেডিং সিস্টেমে ৮১-১০০ পর্যন্ত অ+ দেয়ার কারণে কেউই আগের মত অংকে ১০০তে ১০০ পাওয়ার চেষ্টা করে না। ইংরেজিতে ১০০ তে ৯৯ বা ১০০ পাওয়ার উৎসাহ নিয়ে পড়াশোনা করে না। উদ্দেশ্য যেহেতু অ+ পাওয়া-তাই বেশি নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতা এখানে নেই। এতে করে মেধাবীরা মেধার চর্চা করতে উৎসাহ পাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের উচ্চ শিক্ষায়। আগে মেধাবীরা মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে মেধার প্রতিযোগিতায় কর্মক্ষেত্রে স্থান করে নিত। এখন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ, প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ডজন-ডজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় মেধাবীরা আর উঠে আসতে পারছে না। ফলে মেধা আর জ্ঞানের রাজ্য সংকুচিত হয়ে আসছে। জাতি মেধাশূন্য হচ্ছে। বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ মেধাকোটা এবং ৫৫ শতাংশ বিভিন্ন কোটা রয়েছে। বিভিন্ন কোটার কারণে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে। সমাজে মেধার মূল্যায়ন না থাকায় মেধাবীরা হতাশ ও অনুৎসাহী হয়ে উঠছে। এটা আমাদের সমাজের ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত। আমরা বলতে চাই, মেধার উপর ভিত্তি করে দেশ গড়ার চেষ্টা করুন। মেধাবী জাতি গড়ে তুলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*