আবদুল গাফফার মাহমুদের কলাম

12439430_1691318824473604_4302016380041487977_n-300x160২৭ মার্চ রবিবার রাত সাড়ে আটটায় চান্দগাঁও নতুন থানার বিপরীত দিক থেকে সৌদিয়া পরিবহনে একটি বাসে চেপে বসলাম। উদ্দেশ্য কক্সবাজার যাত্রা। সঙ্গী মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান, মজিবুর রহমান খান, নাসিম আনোয়ার। বাসটি শহরের মধ্যে যেতে যেতে তাদের কয়েকটি কাউন্টারে অপেক্ষা করতে লাগলো। এক পর্যায়ে কয়েকজন যাত্রী অধৈর্য্য হয়ে চালকের সাথে বচসায় লিপ্ত হলো। বেচারা চালকই বা কি করবে, বাসে যাত্রী সংখ্যা একেবারে কম। এদের তো আবার খরচ তুলতে হবে। যাই হোক রাত ৯টার পর গন্তব্যের দিকে বাস ছেড়ে দিল। পথিমধ্যে অবশ্য ওরা বেশকিছু যাত্রী পেয়ে গেছে। এখন বাসের সিটগুলো প্রায় ভরে গেছে। বাসে উঠার আগে মিজান এক বোতল পানি আর ছোট দুই প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে নিয়েছে। বাসের একপাশে দুই সিটে পাশাপাশি নাসিম আর মজিবুর বসেছে। অন্যপাশে অর্থাৎ ডানদিকে আমি আর মিজান বসেছি। বাস আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে। মিজান এক প্যাকেট বিস্কুট নাসিমকে দিয়ে বললো, খেয়ে নিন। বাকি এক প্যাকেট আমাকে দিয়ে খেতে বললো। মিজান খাবে না। বাসা থেকে খেয়ে বেরিয়েছে। মজিবুর ইতিমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। সে কোথাও মাথাটা একটু হেলান দিতে পারলেই ঘুমিয়ে পড়ে। এটা অবশ্য তার একটা ভাল গুণও বটে। একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে প্রায় সাত মাস হাজতবাস করেছে। দিনটি ছিল ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই। ফার্মগেটে কালিগঞ্জের মন্টু ডি কস্তা খুন হয়েছে। এই মন্টু ছিল কারাবন্দী অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মন্টু আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গডফাদার না হলেও সুইডেন আসলামের বন্ধু হবার সুবাদে সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ ছিল তার। সন্ত্রাসীরাও তাকে সমীহ করতো। সেই মন্টু ফার্মগেটে দিবালোকে সবার সামনে খুন হয়েছে। মজিবুরের সঙ্গে মন্টুর পরিচয় ছিল। মন্টু খুন হয়েছে শুনে মজিবুর ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। গিয়ে দেখতে পায়, উৎসুক লোকজন ঘেরাও করে মন্টুর লাশ দেখছে। ইতোমধ্যে সেখানে পুলিশও এসেছে। তারা লাশের সুরতহাল তৈরী করছে। মজিবুর একটু সহজ-সরল প্রকৃতির। ঘোরপ্যাচ বোঝে কম। সে ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে মন্টুর লাশ দেখেই আবেগে বলে উঠে, বিকালেও আমার সঙ্গে মন্টুদার মোবাইলে কথা হয়েছে। তাকে এভাবে কে খুন করলো ? ব্যস আর যাবে কোথায় ? অমনি এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ঝাপটে ধরলো। লাশের সঙ্গে গাড়িতে উঠিয়ে নিল। লাশ নিয়ে যাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। উদ্দেশ্য পোস্টমর্টেম করা। গাড়ি ঢাকা মেডিকেলের গেইটে গিয়ে থামল। লাশ নামানো হলো গাড়ি থেকে। নিয়ে গেল মর্গে। শুরু হলো গাড়িতে বসিয়েই মজিবুরকে জিজ্ঞাসাবাদ। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। উদ্দেশ্য মন্টু খুনের ক্লু বের করা। কিন্তু কোথায় ক্লু, কিসের ক্লু। মজিবুর তো এসব কিছুই জানে না। তার অপরাধ সে লাশ দেখতে গিয়ে আবেগে বলে ফেলেছে, মন্টুদা বিকালেও আমার সঙ্গে  মোবাইলে কথা বলেছে। এতে পুলিশ ধরে নিয়েছে, মজিবুর আন্ডার ওয়ার্ল্ডের লোক। মন্টুর খুনীদের সে অবশ্যই চেনে। যাই হোক, মজিবুরকে নেয়া হলো তেজগাঁও থানায়। ঢুকানো হলো থানা হাজতে। ইতোমধ্যে মজিবুরের বন্ধুরা খবর পেয়ে গেছে। ফার্মগেটে মন্টুর লাশ দেখতে গিয়ে মজিবুর ধরা পড়েছে। পুলিশ তাকে ধরে থানা হাজতে ঢুকিয়েছে। তারা ছুটে গেল তেজগাঁও থানায়। কিন্তু হায় ! তেজগাঁও থানা গরম। শীর্ষ সন্ত্রাসী ধরা পড়েছে। তাও আবার মন্টু খুনের সাথে জড়িত। থানার গেইটে কড়া পুলিশ পাহারা। কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। মজিবুরের বন্ধুরা হতাশ হয়ে ফিরে এলো। দেখা হলো না মজিবুরের সঙ্গে তাদের। তিনদিন মজিবুরকে থানা হাজতেই রাখা হলো। কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু মন্টু হত্যাকা-ের কোন ক্লুই বের করতে পারলো না। পুলিশ ধরে নিলো মজিবুর ‘জাত’ সন্ত্রাসী। সহজে তার মুখ থেকে কথা বের করা যাবে না। তাকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডে এনে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। অবশেষে আদালতে পাঠিয়ে প্রথম দফায় তিনদিনের রিমান্ডে আনা হলো। তারপর দ্বিতীয় দফায় আরো দুইদিন। কিন্তু কোন লাভ হলো না। মজিবুরের কাছ থেকে মন্টু হত্যাকা-ের বিষয়ে কোন তথ্যই পেলো না। আদালত তাকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দিল। সাতমাস হাজত খেটে মজিবুর ছাড়া পায়। ইতোমধ্যে মজিবুর কারাগারের বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে একটি বই লিখে ফেলেছে। নাম দিয়েছে কারাগারের অন্তরালে। এই বইটির এডিট করার জন্য নির্মল চক্রবর্তী তাকে নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। সেই থেকেই তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। অবশ্য কিছুকাল আগে থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়। তাও আবার ওই নির্মল চক্রবর্তীর মাধ্যমে। নাসিম আনোয়ারের অভিযোগ, মজিবুর ভাই ঘুমালেই অনেক জোরে নাক ডাকে তাছাড়া হাত-পা নাড়িয়ে গায়ের উপর তুলে দেয়। তার সঙ্গে এভাবে শোয়া যায় না। আর সে এতবেশী সিগারেট টানে যে, একটা প্যাকেট তার সামনে রাখলে একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করতে থাকবে। একঘন্টার মধ্যে শেষ। মজিবুরের সহজ-সরল ব্যাখ্যা, জেলখানায় ছিলাম। সেখানে তো কোন কাজ নেই। শুধু ঘুমানো আর সিগারেট খাওয়া ছাড়া। ঘুম আর সিগারেট খাওয়ার বেশী বেশী কথা বললে মজিবুর মাঝে-মধ্যে অভিমানও করে। তবে তার এ অভিমান ক্ষণস্থায়ী। বেশী সময় সে অভিমান করে থাকতে পারে না। মজিবুরের এই ‘কারাগারের অন্তরালে’ ছাপাতে গিয়েই নাসিম আনোয়ারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। আর সেই সুবাদে সে যুক্ত হয়েছে লবণের গবেষণা কাজে। মজিবুরই নাসিমকে প্রস্তাব করেছে লবণ গবেষণার সঙ্গে গাফফার ভাইকে নিতে হবে। আবার আমি প্রস্তাব করলাম মিজান চৌধুরীকে আমাদের সঙ্গে নিলে ভাল হবে। শুরু হলো আমাদের পথচলা। আমরা ঢাকা থেকে চলে এলাম চট্টগ্রাম। অতঃপর কক্সবাজার যাত্রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*